Categories

  • Facebook
  • Yahoo
  • Google
  • Live

Posted: 2019-02-02 01:09:04

সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: ছেলেটির মন খারাপ হয়ে যেত ওঁর গ্রামের ছোট ছোট মেয়েগুলোর কথা ভাবলেই। ৪ জি পেরিয়ে ৫ জি-র যুগে এসেও পুরুলিয়ার বুড়দা গ্রামে এখনও বাল্যবিবাহ হয়। মেয়ে ১৫ হলেই পরের ঘরে পাঠানোর জন্য শুরু হয়ে যায় তোড়জোড়। শিক্ষা, সমাজ পরিবর্তন এসব কিছুই কাজে আসে না। স্বপ্ন ছিল একদিন ওঁর গ্রামের মেয়েদের জীবনে আলো আসবে।

ইচ্ছা ছিল দেশের প্রত্যন্ত গ্রামে যে সব মেয়েদের এখনও ছোটবেলাতেই পরের ঘর সামলাতে হয়, আঠেরোর আগেই পেটে এসে যায় ছেলেপিলে তাঁদের জীবন পরিবর্তনের বার্তা দেওয়ার। সেই ইচ্ছা নিয়েই প্রায় ১১ মাস আগে সাইকেল নিয়ে ভারত ভ্রমনে বেরিয়েছিল অক্ষয়। ‘দেশে’ ফিরছে বিশ্বরেকর্ড গড়ে।

কিচ্ছু ছিল না অক্ষয়ের কাছে। চোখে ছিল শুধু স্বপ্ন। অভাবের সংসারে কম বয়সেই বাবার বাড়ি বাড়ি কাগজ দেওয়ার কাজ শুরু করতে হয়। সেই শুরু সাইকেলে চড়া। কাগজ থেকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করতে করতে শুরু হয় বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে পরিচয়। বছর বাইশের অক্ষয় বলেন, “ক্লাস এইট নাইনে পড়ি, তখনই কাগজ দেওয়া শুরু করতে হয়েছিল। এরপর কাগজ পড়তে পড়তেই বাইরের পৃথিবীটাকে জানার ইচ্ছা হয়। গ্রামের লাইব্রেরীতে বেশী করে যেতে শুরু করি। বিবেকানন্দকে নিয়ে পড়াশোনা করতে শুরু করি। ওনার বার্তা এবং ভারত ভ্রমণের মতোই আমারও ইচ্ছা হয় ভারত ভ্রমণের। কিন্তু আমার ইচ্ছা ছিল সাইকেল নিয়ে যাত্রা করব।”

সঙ্গে আছে ভাঙা সাইকেল। সেই সাইকেল দিয়ে কি আর ভারত ভ্রমণ সম্ভব? বাবার কাছে সাইকেল চেয়েছিল। দিতে পারেনি। গ্রামের এক দাদাকে ইচ্ছার কথা জানাতে তিনি একটা সাইকেল কিনে দেন। কিন্তু সাইকেল পেলেই তো হল না। ভারত ভ্রমণের খরচ কে যোগাবে কে? অক্ষয় বলেন, “অনেক কষ্টে এদিক ওদিক থেকে হাজার দুয়েক টাকা জোগাড় হয়। বাবাকে ভারত ভ্রমণ আর আমার বাল্যবিবাহ বন্ধ করার বার্তার কথা বলতে একদমই সায় দেয়নি। গ্রামে পঞ্চায়েতের মিটিং বসেছিল। বাবাকে বলা হয়েছিল, ’আপনার ছেলের মাথা খারাপ হয়ে গেছে, আটকে রাখুন।’ না , আটকানো যায়নি অক্ষয় ভগতকে।

৫ মার্চ ২০১৮, পশ্চিমবঙ্গ থেকে বেরিয়ে বিহার হয়ে মধ্যভারত, উত্তরভারত হয়ে অক্টোবর নাগাদ গুজরাত পৌঁছয় সে। এতদূর পৌঁছল কিভাবে অক্ষয়? রাস্তা কিভাবে চিনল? তিনি জানিয়েছেন, “গুগল ম্যাপ ছিল। সেটা দেখে দেখেই এতটা রাস্তা পেরিয়েছি। পথে অনেক গ্রাম পেরিয়েছি। গ্রামের স্কুলে গিয়ে আমার বার্তা দিয়ে এসেছি। নিজের মতো বোঝানোর চেষ্টা করেছি।”

রাজস্থানে পৌঁছে শরীর খারাপ করে। ভেবেছিল আর হয়তো হবে না। কিন্তু ইচ্ছেটা মনকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। সেই ইচ্ছের বলেই সুস্থ হয়ে ওঠা। আবার শুরু হয় সাইকেল চালানো। দিল্লি পৌঁছে পরিচয় হয় সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারকের সঙ্গে। তিনি সব শুনে নতুন সাইকেল কিনে দেন। অক্ষয় বলেন, “পথে অনেকে সাহায্য করেছে আমাকে। না হলে আমার পক্ষে এতদূর আসা সম্ভব ছিল না।”

গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের মুখোমুখি হওয়া অজান্তেই। সেই যাত্রা শুরু হয় কর্ণাটকের হুবলিতে পৌঁছে। হুবলি সাইক্লিং ক্লাবের আয়োজনে ১,২৩৫ জন সিঙ্গেল লাইনে প্রায় ৪ কিলোমিটার লম্বা লাইন তৈরি করে সাইকেল চালিয়েছেন। সেখানে পশ্চিমবঙ্গের একমাত্র প্রতিনিধি ছিল অক্ষয়। প্রসঙ্গত এর আগে এই রেকর্ড ছিল বাংলাদেশের। সেটাই এখন অক্ষয়ের দখলে। এতদিনে সাইকেলে পেরিয়ে এসেছে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটারের বেশী রাস্তা।

না, ক্লান্ত হয়নি অক্ষয়। তাঁর কথায়, “যদি আমি হার মানি তাহলে হার মানবে গ্রাম বাংলার সেই ছোট মেয়েটি যার মনে হাজারও স্বপ্ন উঁকি দেয়। হার মানবে সেই মা যার মেয়েক পৃথিবীর আলো দেখতে দেয়নি এই সমাজ । হার মানবে সেই নিষ্পাপ শিশুর কান্না যাকে কিনা তার কোনো পরিচিত মুখটাই তার শরীরের উপর নির্যাতন করে।”

অক্ষয় এখন বেঙ্গালুরুতে আছেন। সেখান থেকেই জানালেন, “আমি হার মানিনি। হার মানব না । আর তিন মাস, তারপর সম্পূর্ণ হবে আমার ভারত ভ্রমণ। ভারত ভ্রমন শেষ হয়ে গেলেও শেষ হবে না আমার যাত্রা। শেষ হবে আমার মায়ের অপেক্ষা।” মনে মনে হার না মানা ছেলেটি বললেন,”কানে এখন একটাই শব্দ ভাসছে জানেন। How is the Josh ? High sir”।

  • 0 Comment(s)
Be the first person to like this.